ভয়াবহ এক সত্যি উন্মোচিত হয়েছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। মাত্র ৫ মিলিমিটারের চেয়েও ছোট প্লাস্টিকের এই কণা (মাইক্রোপ্লাস্টিক) এখন আর শুধু সমুদ্র বা মাটিতে নেই—এটি ঢুকে পড়েছে মানুষের মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎ, প্লাসেন্টা, অস্থিমজ্জা এমনকি শুক্রাণুতেও। যদিও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলছে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সম্ভাব্য ক্ষতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক ও নীরব মহামারির মতো।
কী ক্ষতি করছে এই প্লাস্টিক কণা?
হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালীর জন্য মারাত্মক হুমকি: গবেষণায় দেখা গেছে, ধমনীর দেয়ালে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা থাকা রোগীদের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায় ৩.৫ গুণ! পাশাপাশি হৃদযন্ত্র বিকলের ঝুঁকি বাড়ে ১৩% এবং এটি অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন (অ্যারিথমিয়া) ও ব্রেন স্ট্রোকেরও কারণ।
হরমোন ও প্রজননে বিপর্যয়: প্লাস্টিকের সঙ্গে থাকা BPA-র মতো রাসায়নিক হরমোনের কাজে বাধা দেয়। ফলে কমে যায় শুক্রাণুর গুণমান, বাড়ে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা ও স্থূলতার ঝুঁকি।
ক্যান্সারের আশঙ্কা: এই কণায় থাকা বেনজিন, অ্যাক্রিলিক অ্যাসিডের মতো কার্সিনোজেন এবং শরীরের দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ—উভয়ই ক্যান্সার কোষ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
স্নায়ু ও শ্বাসতন্ত্রে আঘাত: ন্যানোপ্লাস্টিক মস্তিষ্কের ব্লাড-ব্রেইন ব্যারিয়ার ভেদ করে ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রংশ) ও ব্রেইন টিউমারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে গিয়ে বাড়াচ্ছে হাঁপানি ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট।
পাচনতন্ত্র ও ‘ভেক্টর ইফেক্ট’: উপকারী গাট ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে বাড়ায় ডায়রিয়া ও আইবিডি-র ঝুঁকি। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো, এই প্লাস্টিকের গায়ে আটকে থাকা সীসা, পারদের মতো ভারী ধাতু শরীরের ভেতর ধীরে ধীরে বিষ ছড়ায়, যা একক দূষণের চেয়ে বহুগুণ ক্ষতিকর।
কীভাবে ঢুকছে শরীরে?
প্রধান পথ খাদ্য ও পানীয়—বোতলজাত পানি, সামুদ্রিক খাবার (ঝিনুক), লবণ, বিয়ার, মধু, এমনকি প্লাস্টিকের টি-ব্যাগ ও চুইংগাম! পাশাপাশি ঘরের ধুলোবালি, সিনথেটিক কাপড়ের আঁশ, ডিসপোজেবল মাস্ক, টুথপেস্টের স্ক্রাব এবং কিছু ইনট্রাভেনাস (IV) স্যালাইনও এই প্লাস্টিক বহন করছে।
বাঁচার উপায় কী? বিশেষজ্ঞের পরামর্শ:
সম্পূর্ণ এড়ানো সম্ভব না হলেও, কিছু অভ্যাস মানলে শরীরে এর পরিমাণ অনেকটাই কমাতে পারেন—
পানি ফুটিয়ে খান: সবচেয়ে কার্যকরী উপায়! কলের পানি ফুটিয়ে নিলে প্রায় ৯০% মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর হয়ে যায়। প্লাস্টিকের বোতল বাদ দিয়ে ব্যবহার করুন স্টেইনলেস স্টিল বা কাচের বোতল।
রান্না ও সংরক্ষণে সাবধান: গরম, তেল-চর্বিযুক্ত বা টক খাবার কখনো প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না। মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিক গরম করা একেবারেই নিষেধ। প্লাস্টিকের কাটিং বোর্ডের বদলে বেছে নিন কাঠ বা বাঁশের বোর্ড।
প্রতিদিনের ব্যবহারে বদল: কাচ, সিরামিক বা স্টেইনলেস স্টিলের থালা-গ্লাস ব্যবহার করুন। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের স্ট্র, চামচ, প্লেট এড়িয়ে চলুন। পলিয়েস্টারের বদলে পরুন তুলো, পাট বা লিনেনের প্রাকৃতিক কাপড়।
ঘর পরিষ্কার রাখুন: ভেজা কাপড় দিয়ে ধুলো মুছুন (শুকনা কাপড়ে উড়ে যায়) এবং HEPA ফিল্টারযুক্ত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার করুন। নিয়মিত জানালা খুলে ঘরে বাতাস চলাচল করান।
উল্লেখিত অভ্যাসগুলো বদলানোর মাদ্যমে নীরব এই বিষ থেকে নিজেকে ও আপনার পরিবারকে দূরে রাখুন।
লেখক পরিচিতি
তৌহিদ টিটু, রিসার্স কর্মী আইসিডিডিআরবি


✍️ মন্তব্য লিখুন