গত ১৭ অক্টোবর ঘটা করে সই হয়েছে ‘জলাই সনদ’। আট মাস ধরে বিস্তর আলোচনা-পর্যালোচনার পর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়েছে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। তবে যতটা উচ্ছ্বাস এই দলিল স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দেখা যাওয়ার কথা ছিল, তা দেখা যায়নি। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ যেসব দলের নেতারা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন ও দলিলে স্বাক্ষর করেছেন, তাদের উচ্ছ্বসিত মনে হয়নি। একমাত্র অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকেই সহাস্যে স্বাক্ষরিত দলিল উঁচিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। পৃথিবীর অর্ধেকটা জয় করার পর মহাবীর আলেকজান্ডার কীভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন, তা দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তবে সেদিন জাতীয় সংসদ চত্বরে জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর উচ্ছ্বসিত ড. ইউনূসের অভিব্যক্তি দেখে আলেকজান্ডারের উল্লাস না দেখার আফসোস অনেকটাই মিটেছে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো। তিনি এতটাই আনন্দিত হয়েছেন যে, কোনো রাখঢাক না রেখে বাংলাদেশের মানুষকে নতুন জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। বলেছেন, ‘আজ থেকে আমরা নবজন্ম লাভ করলাম।’ ১৭ অক্টোবর নতুন জন্ম নেওয়া আমরা এখন কোন জাতি বা প্রজাতি হিসেবে পরিচিত হব; সে প্রশ্নে না গিয়েও একটি প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়—একটি জাতির নবজন্ম কি এতই সহজ? একসময় আমরা ব্রিটিশ শাসনাধীনে থেকে নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে বাঙালি হলেও জাতি হিসেবে ‘ব্রিটিশ-ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে পরিচিত ছিলাম। তারপর ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিচিতি জুটল ‘পাকিস্তানি বাঙালি’ হিসেবে। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করি। আমাদের জাতীয় পরিচিতি হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। পরে নানা গবেষণায় প্রমাণিত হয়, বাংলাদেশ ভূখণ্ডে বসবাসকারী বাঙালি ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা এক জাতি নয়। এ সত্যকে ধারণ করে সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান তার ঐতিহাসিক তত্ত্ব ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ উদঘাটন করেন। আমাদের নাগরিক পরিচয় এখন ‘বাংলাদেশি’। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি বিখ্যাত নিবন্ধের নাম ‘একটি জাতির জন্ম’। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে তারা কীভাবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, কোন পরিস্থিতিতে তিনি বিদ্রোহ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার সবিস্তর বর্ণনা রয়েছে ওই নিবন্ধে। জিয়াউর রহমানের নিবন্ধের শিরোনামটি যথার্থ। কেননা, একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণ, জিয়ার বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সূত্রপাত হয়েছিল বাংলাদেশের দীর্ঘ মুক্তি আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্বের। আর তার সফল সমাপ্তির মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের। এর ফলে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান যেমন বিশ্ব-মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, তেমনি এ দেশের নাগরিকরাও নতুন জাতি হিসেবে পরিচিত পায়। বলা যায়, ব্রিটিশ-পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের নাগপাশ ছিন্ন করে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষ নবজন্ম লাভ করে। যার সুবাদে আমরা পাই নতুন একটি জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত ও নতুন জাতীয় পরিচিতি। কিন্তু ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ স্বাক্ষরের পর জাতি হিসেবে আমাদের নবজন্ম কী করে হলো— এটা আমার ভোঁতা মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না।
১৯৪৭ সালে র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী, ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম দেন। পাকিস্তানের দুই অংশ পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। এ দুই অংশের মধ্যে ভারতের অবস্থান, দূরত্ব প্রায় ১৪০০ মাইল। সে সময় ভারতীয় কংগ্রেস নেতারা লর্ড মাউন্টব্যাটেনের যোগসাজশে ভারতবর্ষকে তাদের ইচ্ছেমতো ভাগ করে নেয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ মন্তব্য করেছিলেন, ‘এই পোকায় কাটা পাকিস্তান দিয়ে আমি কী করব?’ অর্থাৎ তিনি যেভাবে পাকিস্তান চেয়েছিলেন, তা পাননি। ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নিয়ে জন্ম নিতে পারেনি। ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় মহাসমারোহে জুলাই সনদ নামে যে দলিলটি স্বাক্ষরিত হলো, সেটাকে কেন যেন ‘পোকায় কাটা সনদ’ বলতে ইচ্ছে করছে। কেউ যদি প্রশ্ন করেন, এরকম মনে হওয়ার হেতু কী, তাহলে জবাব একটাই—প্রধান উপদেষ্টা ও কথিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরা ছাড়া আর যারা তাতে সই করেছেন, তারা কেউই স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে তা করেননি। কেউ করেছেন চাপে পড়ে, কেউ বাধ্য হয়ে। আবার কেউ ‘সই না করলে যদি অপাঙক্তেয় হয়ে যাই’, এই ভয়ে করেছেন। গণফোরাম নামের ক্ষয়িষ্ণু দলটি তো স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সই না করে দুদিন পরে ঐকমত্য কমিশন অফিসে গিয়ে তা করে এসেছে। অনুষ্ঠানে গিয়েও কেন তারা সেদিন স্বাক্ষর করল না, কেন আবার দুদিন পরেই সুবোধ বালকের মতো দস্তখত করে এলো, এর কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, যারা ছিল জুলাই সনদের প্রধান দাবিদার, এ সনদ স্বাক্ষরিত না হলে ‘দেশ রসাতলে যাবে’ বলে যারা এতদিন চিল্লাপাল্লা করে তোলপাড় করছিল; তারা, মানে এনসিপি রহস্যজনক কারণে সই করা থেকে বিরত থেকেছে। কেন তাদের এই গোসসা? এর কারণ কেউ জানে না। অবশ্য বলা হচ্ছে, তারা যেভাবে সনদ চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা সেভাবে তৈরি হয়নি। আরও মজার ব্যাপার হলো, ‘জুলাই সনদ না হলে, পিআর না হলে দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না’—বলে কোরাস গাওয়া দুই দল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি এখন এ ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত। জামায়াতে ইসলামী এতদিন নানা শর্ত দিলেও শেষ মুহূর্তে স্বাক্ষর করেছে। মুরুব্বির এহেন ইউটার্নে বিস্মিত ক্ষুব্ধ এনসিপি তাই মন্তব্য করেছে, ‘কিছু দল জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।’ এই ‘কিছু দল’ যে জামায়াতে ইসলামী, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে দলিল স্বাক্ষরের দুদিন পর জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অভিযোগে। তিনি বলেছেন, ‘জামায়াতের পিআর আন্দোলন সুচিন্তিত রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।’ গত ১৯ অক্টোবর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের সংস্কার প্রক্রিয়া এবং জাতীয় সংলাপকে গণঅভ্যুত্থানের আলোকে সংবিধান ও রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রকৃত প্রশ্ন থেকে ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে এটা (পিআর) তোলা হয়েছে।’ নাহিদ ইসলাম আরও লিখেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী কখনোই সংস্কার আলোচনায় অংশ নেয়নি, না জুলাইয়ের আগে, না পরে। তারা কোনো গঠনমূলক প্রস্তাব দেয়নি। কোনো সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেনি। এমনকি একটি গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিও কোনো অঙ্গীকার দেখায়নি। ঐকমত্য কমিশনের মধ্যে তাদের আকস্মিক সংস্কার-সমর্থন কোনো বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ছিল না, ছিল একটি কৌশলগত অনুপ্রবেশ, সংস্কারবাদের মুখোশে রাজনৈতিক অন্তর্ঘাত।’ (কালবেলা, ২০ অক্টোবর, ২০২৫)।


✍️ মন্তব্য লিখুন