ইয়েমেনের পশ্চিম রণাঙ্গনে প্রতিরোধ বাহিনীর পতনের মূল কারণ হুতিদের সেনাসংখ্যা ছিল না। এর পেছনে কাজ করেছে রাশিয়া ও ইরানের এক যৌথ গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক। রাশিয়া মহাকাশভিত্তিক স্যাটেলাইট নজরদারি ও সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স জুগিয়েছে। আর ইরান সেই প্রযুক্তিকে হুতিদের সামরিক কমান্ডের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে তারেক সালেহর ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস’-এর ভেতরে চর ঢুকিয়ে দেয় হুতিরা। কারিগরি তথ্য আর ভেতরের চরের সংবাদের মেলবন্ধন ঘটিয়েই তারা রণক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা আদায় করে নেয়।
আমার তৈরি বহুমুখী গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয় ব্যবস্থা ‘প্রজেক্ট অরোরাহ’র মাধ্যমে আমি আগেই বিষয়টি শনাক্ত করেছিলাম। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর রাশিয়ার সামরিক নজরদারির গতিপ্রকৃতি আমরা নথিবদ্ধ করি। তখন সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানের ওপর সতর্ক নজর রেখেছিল মস্কো। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনেও সক্রিয় ছিল রুশ স্যাটেলাইটের নজরদারি। সিএনএনের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও আমাদের এই গবেষণার বিস্তারিত উঠে আসে।
ইরান যুদ্ধের সময়েই স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারির নতুন এক কৌশল সামনে আসে। সেখানে স্যাটেলাইট শুধু তথ্য জোগায়নি। হামলার আগেই তারা রণক্ষেত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা তৈরি করে দিয়েছিল। রাশিয়ার স্যাটেলাইট বিপক্ষের সেনা মোতায়েন, তাদের চলাচলের পথ ও সদর দপ্তরের অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে। আর সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে তারা চিহ্নিত করে ইলেকট্রনিক সংকেত, যোগাযোগের ধরন ও অভ্যন্তরীণ কমান্ড কাঠামো।
এই গোয়েন্দা সুবিধা কোনো একক মহাকাশযান থেকে আসেনি। বিভিন্ন কক্ষপথের একাধিক স্যাটেলাইট সমন্বিতভাবে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ফলে সেনাদলের প্রতিটি নড়াচড়ার ধারাবাহিক গতিবিধি সহজেই তাদের চোখে পড়েছে। সেই একই কৌশল রাশিয়া এবার ইয়েমেনের মাটিতে কাজে লাগিয়েছে।
ইয়েমেনে এই রুশ নজরদারির সঙ্গে মাঠের সামরিক শক্তির সমন্বয় ঘটিয়েছে ইরান। রুশ স্যাটেলাইটের তথ্যের সঙ্গে তারা হুতিদের মাঠপর্যায়ের নজরদারি যুক্ত করেছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে তারেক সালেহর বাহিনীর ভেতরে থাকা হুতি চরদের গোপন তথ্য। ফলে হুতিরা আগেই জেনে যায় কোন সদর দপ্তর সক্রিয় আছে, কোথায় সেনাদের আসল অবস্থান আর কোথায় সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এই সমন্বিত তথ্যের জোরেই তারা পশ্চিম উপকূলের দুর্বল জায়গাগুলোতে আঘাত হানতে পেরেছে।
ঠিক এ কারণেই পশ্চিমের ফ্রন্টলাইন ভেঙে পড়ে। সৌদি নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মাঠের প্রতিরোধ বাহিনীর যোগাযোগের পথটি অকার্যকর হয়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিরোধ ইউনিটের নিজেদের মধ্যকার যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে ওপরের স্তরে পৌঁছাতে থাকে ভুল তথ্য, আর মাঠের সেনারা পেতে থাকে বিভ্রান্তিকর নির্দেশ।
রণাঙ্গনে এর চড়া মাশুল দিতে হয়েছে। প্রতিরোধ বাহিনীর এক কমান্ডার অবস্থান ধরে রাখার নির্দেশ স্বীকার করেও পরে সেনা প্রত্যাহার করে নেন। আরেক কমান্ডার জানান, একটি সামরিক বিমানঘাঁটি খালি করা হয়েছে। অথচ সেখানে তখনো অন্য একটি দলের সদস্যরা অবস্থান করছিল। ভুল তথ্যের কারণে সেখানে বিমান হামলায় নিজেদের সেনাদের প্রাণহানি ঘটে। লোহিত সাগরের মোখায় মোতায়েন থাকা সৌদি স্পেশাল ফোর্সের দল সবার আগে বুঝতে পারে যে, মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে আসা রিপোর্টের কোনো মিল নেই।
সৌদি বিমানবাহিনী হামলার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। কিন্তু মাঠে মিত্র সেনাদের আসল অবস্থান নিশ্চিত না থাকায় তারা পূর্ণ শক্তিতে বিমান হামলা চালাতে পারেনি। সমস্যা আরও বাড়ে অন্য জায়গায়। দেখা যায়, কাগজপত্রে তালিকাভুক্ত সেনাদের অর্ধেকের বেশি রণাঙ্গনে হাজিরই নেই। দীর্ঘ কয়েক মাসের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ও নিয়মিত বেতন দেওয়ার পরও এই বিশৃঙ্খলা ঘটে। ফলে জাবাল আল-নারের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়। মূল হুতি বাহিনী পৌঁছানোর আগেই প্রতিরোধ যোদ্ধারা অবস্থান ছেড়ে সরে যায়।
এই ব্যর্থতা থেকেই বড় শিক্ষা নিয়েছে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। তারা পুরো কমান্ড ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছে। যৌথ বাহিনীর বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের সঙ্গে মাঠের সেনাদের সরাসরি যুক্ত করতে বিশেষ কন্ট্রোলার টিম নামানো হয়েছে। সৌদি তদারকি দলগুলো এখন সরেজমিনে গিয়ে সেনাদের অবস্থান ও প্রস্তুতি যাচাই করছে। নির্দেশ যাচাইয়ের কঠোর নিয়ম ও আধুনিক এনক্রিপ্টেড যোগাযোগের মাধ্যমে তারা মোখার সেই নিরাপত্তা ফাঁকফোকর পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে।
সৌদি আরব এর আগেও এমন কৌশল কাজে লাগিয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দক্ষিণ ইয়েমেনে আবু ধাবির কমান্ড নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল সৌদি সামরিক গোয়েন্দারা। বাইরের মদদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বাহিনী দ্রুত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে হুতিদের পেছনের সামরিক ব্যবস্থাটি আরও অনেক বেশি আধুনিক। রাশিয়া দিচ্ছে স্যাটেলাইট ও ইলেকট্রনিক নজরদারি, আর ইরান সেই তথ্য মাঠে কাজে লাগাচ্ছে। তবে এই আধুনিক ব্যবস্থার ভেতরেই বড় দুর্বলতা লুকিয়ে আছে। এই ব্যবস্থা চালু রাখতে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ, বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং সানার কেন্দ্রীয় দপ্তরের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সংযোগ প্রয়োজন।
এখন সেই দুর্বল জায়গাগুলোতেই আঘাত হানছে সৌদি জোট। গত ১৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সানায় ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন শীর্ষ কমান্ড কাঠামোর ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো হয়। এই হামলায় হুতিদের অন্তত দুজন মেজর জেনারেল, সাতজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ৩২ জন কর্নেল নিহত হয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জামও ধ্বংস হয়ে গেছে। হুতিদের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগী বিদেশি উপদেষ্টারাও সেখানে নিহত হয়েছেন বলে জোরালো তথ্য রয়েছে। কৌশলগত কারণেই এসব বিস্তারিত তথ্য আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এই হামলার প্রভাব কেবল নিহতদের সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। শীর্ষ নেতৃত্ব ধ্বংস হওয়ায় রণাঙ্গনে তথ্য সংগ্রহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও হামলা বাস্তবায়নের পুরো চেইন ভেঙে পড়েছে। বাঁচার জন্য এখন হুতিদের সদর দপ্তরগুলো বারবার জায়গা বদল করছে। বেঁচে যাওয়া কমান্ডার ও কনিষ্ঠ ইরানি উপদেষ্টারা নতুন করে যোগাযোগ চালুর চেষ্টা করছেন। আর যোগাযোগ চালু করতে গেলেই নতুন ইলেকট্রনিক সংকেত তৈরি হচ্ছে। সেই সংকেত সৌদি যৌথ বাহিনীর আধুনিক রাডারে সহজেই ধরা পড়ছে এবং সেখানে নির্ভুল হামলা চালানো হচ্ছে।
ঠিক এই কারণেই পশ্চিম উপকূলে হুতিরা তাদের অগ্রযাত্রার গতি হারিয়ে ফেলেছে। যে ফাঁকফোকর গলে তারা প্রতিরোধ বাহিনীর প্রতিরক্ষা ভেদ করেছিল, সেই পথগুলো সৌদি জোট এখন বন্ধ করে দিয়েছে। অন্যদিকে হুতিদের নিজেদের গোয়েন্দা ও কমান্ড নেটওয়ার্কও একের পর এক হামলায় অন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে পশ্চিম উপকূলের সাময়িক ধাক্কা সৌদি জোটের দুর্বলতা না হয়ে বড় এক শিক্ষায় পরিণত হয়েছে।
কমান্ড, যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য ও হামলা পরিচালনার আধুনিক প্রযুক্তিতে সৌদি যৌথ বাহিনী নিজেদের পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। বহু বছর ধরে সৌদি আরব যে কৌশলগত ধৈর্য দেখিয়েছিল, হুতিদের লাগাতার উসকানি সেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। সৌদি জোট এখন এক সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই লড়াই এমন এক শত্রুর বিরুদ্ধে শুরু হতে যাচ্ছে, যাদের বিদেশি সহায়তার মূল নেটওয়ার্কটি ইতিমধ্যেই হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এটাই এই যুদ্ধের চূড়ান্ত বাঁক। হুতিদের শক্তি বাড়াতে যে রুশ-ইরানি গোয়েন্দা চক্র কাজ করছিল, সৌদি জোটের মূল অভিযান শুরুর আগেই তা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। একসময় কমান্ডের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হুতিরা সাফল্য পেয়েছিল। এখন সেই বহিরাগত গোয়েন্দা ছাতাটিই তাদের মাথার ওপর থেকে সরে যাচ্ছে। হুতিদের এখন যুদ্ধক্ষেত্রের কঠিন বাস্তবতায় সরাসরি লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে।
লেখক পরিচিতি
নওয়াফ ওবায়েদ কিংস কলেজ লন্ডনের ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার স্টাডিজ’-এর সিনিয়র ফেলো এবং মাল্টিডোমেন ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম ‘প্রজেক্ট অরোরাহ’র প্রতিষ্ঠাতা। সৌদি নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলবিষয়ক একাধিক গ্রন্থের প্রণেতা তিনি।


✍️ মন্তব্য লিখুন