শিক্ষার্থীদের মধ্যে সামাজিক অপরাধপ্রবণতা ও কিশোর গ্যাং কালচার ঠেকাতে এবং তাদের মধ্যে সামাজিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে ৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। প্রথম ধাপে ৩৯১টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে পুরোটাই সরকারি অর্থায়ন করা হবে।
মাউশি অধিদপ্তর এই প্রকল্পের সারসংক্ষেপ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। শিগগিরই এ প্রকল্প ‘সবুজ পাতায়’ (অনুমোদিত তালিকায়) অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও জানা গেছে।
সূত্রমতে, দেশের সব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সামাজিক অবক্ষয় রোধে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি, দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ জাগ্রত করা, পরমতের প্রতি সহিষ্ণুতা তৈরি করা এবং সামাজিক অপরাধপ্রবণতা ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি হ্রাস করা এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
এছাড়া দেশের উন্নয়নে তারুণ্যশক্তির ব্যবহারের সুযোগ উপলব্ধি করা, তরুণ সমাজকে সামাজিক দায়বদ্ধতা অনুধাবনে উদ্বুদ্ধ করা এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষিত, প্রযুক্তিনির্ভর, স্বনির্ভর ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্নের বীজ রোপণ করাও এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রকল্পের যৌক্তিকতা বিবেচনায় মাউশি অধিদপ্তর জানিয়েছে, বর্তমান সরকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ দেশের সব মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য গঠনমূলক, শক্তিশালী ও আপসহীন ভূমিকা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড, খাল খনন কর্মসূচিসহ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক, কর্মমুখী, উৎপাদনমুখী ও সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমৃদ্ধ ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে দেশের ৯০ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—যারা গ্রামে বাস করে—তারা অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের সম্পৃক্ত করে উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন।
প্রকল্পের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে সামাজিক, নৈতিক, মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় পুরো সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর ফলে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। সামাজিক, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের বন্ধন শিথিল হচ্ছে; এমনকি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেরও অবনতি ঘটছে। তাই সামাজিক শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রচারণামূলক কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর (শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক) কাছে পৌঁছে দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। নৈতিকতাবোধসম্পন্ন জাতি গঠন ব্যতিরেকে উন্নয়নের সব সূচকই অর্থহীন—এটি বাংলাদেশে প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর কাছে সরকারের সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক, মানবিক, নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কুফল সম্পর্কে সচেতন করা এবং ইতিবাচক মূল্যবোধ জাগ্রত করার প্রচেষ্টা বাস্তবায়ন করা জরুরি।
প্রকল্প বিবরণীতে বলা হয়, বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা ও সহানুভূতির শিক্ষা দেওয়ার জন্য কাঠামোগত, সাংস্কৃতিকভাবে অভিযোজিত, ব্যবহারিক ও ইন্টারেক্টিভ উপকরণের অভাব রয়েছে। ক্রমবর্ধমান সামাজিক উত্তেজনা, নৈতিক অবক্ষয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক মূল্যবোধের ওপর বিশ্বব্যাপী গুরুত্বারোপের দরুন নৈতিকতার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, এ প্রকল্পটি গেমভিত্তিক শিক্ষা, তথ্যচিত্র, কার্টুন ও কমিকভিত্তিক বিষয়বস্তু, ইন্টারেক্টিভ কুইজ প্রতিযোগিতা, সামাজিক ও আবেগিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং ব্যবহারিক শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বৈশ্বিক নাগরিকত্ব শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়নের শিক্ষা স্থানীয়করণ করে শূন্যস্থান পূরণ করবে।
আরও বলা হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ (আনন্দময় শিক্ষা)-এর কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দলগত কাজ, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের উন্নয়ন (পার্সোনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট), পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের পরিচালক প্রফেসর ড. মীর জাহীদা নাজনীন বলেন, যৌক্তিক বিবেচনায় এ প্রকল্পের সারসংক্ষেপ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতাসম্পন্ন ও আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


✍️ মন্তব্য লিখুন