জ্বালানি খাতের বাড়তি ভর্তুকি ব্যয় মেটানোসহ সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে আগামী তিন বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিতে চায় সরকার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের প্রথম দিনে গতকাল সোমবার বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের আলাদা বৈঠকে ওই সহায়তার অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
জ্বালানি ভর্তুকি ও অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে বিশ্বব্যাংক থেকে নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে সংস্থাটির সঙ্গে তিন বছরের জন্য একটি বিশেষ কর্মসূচি চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে প্রস্তাবিত ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পেতেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
গতকাল বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার প্রথম দিনে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের দেড় ঘণ্টার বৈঠক হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন সরকারের এমন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, জ্বালানি ভর্তুকি মেটানো ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে আগামী তিন বছরের জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে বার্ষিক সভা কাভার করতে আসা সাংবাদিকদের অর্থমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এতে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ কাটিয়ে উঠতে আগামী দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি সুরক্ষাবলয় তৈরিতে বিশ্বব্যাংক সহযোগিতা করবে। এ জন্য সংস্থাটির সঙ্গে কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনের সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নির্ধারিত হবে।
বিশ্বব্যাংকের নিয়মিত সহায়তার বাইরে অতিরিক্ত ঋণ পাওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তেল ও গ্যাসের উচ্চমূল্যের কারণে জ্বালানি খাতে যে বাড়তি ব্যয় তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আরও ঋণ সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। খুব শিগগির বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল আলোচনা চূড়ান্ত করতে ঢাকা সফর করবে।
অন্যদিকে আইএমএফের কাছ থেকে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার শর্তগুলো একসঙ্গে বাস্তবায়নের পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনা করছে সরকার। এ বিষয়ে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শর্তগুলো পরিমার্জন করে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
আইএমএফের শর্তগুলো বাস্তবায়ন কঠিন হবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, কিছু নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো পরিমার্জন করা সম্ভব। একসঙ্গে অনেক সংস্কার চাপিয়ে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঋণের শর্ত নিয়ে আগামী দুদিন আইএমএফের সঙ্গে বৈঠক চলবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব পরিকল্পনার বড় ধরনের কোনো মতপার্থক্য নেই। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই বিষয়গুলোর সমাধান করা সম্ভব বলে সরকার আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর সাংবাদিকদের বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতিগত ঐকমত্য রয়েছে। তিনি বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থনৈতিক সংস্কারের যে রূপরেখা সরকার নিয়েছে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীরাও তার মূল লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে একমত।
বিনিয়োগ বাড়াতে চীন, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে বহুমুখী উৎস থেকে অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু করা, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতের বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়াও সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তিনি বলেন, থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কয়েকটি সম্ভাবনাময় খাত তুলে ধরা হয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে কৃষিজাত পণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো ফলের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। কৃষকরাও অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে হালাল বাজারসহ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ব্যবস্থাও গড়ে উঠতে পারে।
ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনে আইএফসির আগ্রহ
দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পুনর্গঠনে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে– এমন প্রস্তাব সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে এ জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ রেখেছে। তবে শুধু সরকারি অর্থায়নে এই চাহিদা পূরণ করা কঠিন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আইএফসি ব্যাংকের মূলধন পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি ইকুইটি থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমানতকারীদের মধ্যে যে ভীতি তৈরি হয়েছিল, তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। ব্যাংকে আমানত ফিরছে এবং নিট আমানত বাড়ছে। পুঁজিবাজারেও ইতিবাচক ধারা ফিরছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবার বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
উন্নয়ন অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের নতুন উদ্যোগ
উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে দানশীল ব্যক্তি ও দাতব্য সংস্থাগুলোর অর্থ, জ্ঞান এবং বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক কাজে লাগাতে ‘ফিলানথ্রপি হাব’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ। বার্ষিক সভার উদ্বোধনী দিনে ফিলানথ্রপি ফোরামে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে উদ্ভাবনী ধারণা ও পরীক্ষামূলক প্রকল্পগুলোকে বৃহত্তর পরিসরে বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। পাশাপাশি টেকসই স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়াতে এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় ফিলানথ্রপিক নেটওয়ার্ক এভিপিএন এবং টেমাসেক ট্রাস্টের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সরকারি সম্পদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে বেসরকারি ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন, জ্ঞান ও নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে বিশ্বজুড়ে টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।


✍️ মন্তব্য লিখুন