সন্তানের ভালো ফলের পুরস্কার হিসেবে দামি স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিলেন মা-বাবা। কিন্তু সেই উপহারই একসময় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানীর লালমাটিয়ার বাসিন্দা নুরুন্নেসা তালুকদার (৪০) জানান, মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির কারণে তার মেয়ের উচ্চ মাধ্যমিকের ফল খারাপ হয়েছে। খিটখিটে মেজাজ, একাকিত্ব ও মানসিক অবসাদের লক্ষণও দেখা দিয়েছে। মেয়ের মানসিক সুস্থতা ফেরাতে এখন চিকিৎসকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে পরিবারটি।
একটি পরিবারের এই অভিজ্ঞতা শুধু মোবাইল আসক্তির নেতিবাচক দিক তুলে ধরে না, বরং সন্তানদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রেমের প্রলোভন, ব্ল্যাকমেইল ও যৌন নিপীড়নের ঝুঁকি বাড়ছে। অনলাইন যোগাযোগের সূত্র ধরে ভয়াবহ অপরাধের শিকার হওয়ার ঘটনাও সামনে আসছে।
গত সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম হত্যাকাণ্ড এবং ৮ অক্টোবর সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ড এ উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। তাজমিনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাড়ি ছাড়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল বলে পুলিশের ভাষ্য। পরে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে সে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনায় কথিত প্রেমিক রিয়াজুদ্দিন রাজুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অন্যদিকে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে মোবাইলকে কেন্দ্র করে। ফলে শিশু-কিশোরদের অনলাইন যোগাযোগ ও অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশই ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইমোতে প্রেমের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন, এদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা জানান, মা-বাবা কিংবা অভিভাবকরা বুঝে কিংবা না বুঝে শিশুদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছেন। তারা কল্পনাও করতে পারছেন না এর মাধ্যমে সন্তানের কত বড় সর্বনাশ নিজেই ডেকে আনছেন। বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের (উঠতি বয়সি) মোবাইল এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার তাদের নানা ধরনের অনলাইন প্রতারণা ও প্রেমের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতনের ধরনও জটিল হচ্ছে। ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা, অনলাইনে গ্রুমিং, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা পাঠানো, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় এবং ব্ল্যাকমেইলের মতো ঘটনা শিশুদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। ভুয়া পরিচয়ে বন্ধুত্ব, অনলাইন গ্রুমিং, অনাকাঙ্ক্ষিত যৌন বার্তা, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল তাদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


✍️ মন্তব্য লিখুন