গৌরনদীর জ্ঞান ভান্ডার উইপোকা আর ইঁদুরে খাচ্ছে

বিশ্বজিত সরকার বিপ্লব, গৌরনদী (বরিশাল) প্রতিনিধি

0 13

বরিশালের গৌরনদীর জ্ঞানভান্ডার খ্যাত শহিদ স্বৃতি পাঠাগার (পাবলিক লাইব্রেরী)। রাজনৈতিক কারনে বারবার নাম পরিবর্তন হয়েছে। বিভিন্ন ভাষার দুর্লভ ১৫ হাজার গ্রন্থের ভান্ডার এখন উইপোকা আর ইঁদুরের খাদ্যে পরিনত হয়েছে। চুরিও হয়ে গেছে অনেক মুল্যবান গ্রন্থ’। অনেকে মুল্যবান বই পড়তে নিয়ে ফেরত দেননি।

অপ্রতুল হলেও সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করার সরব প্রতিষ্ঠানটি অযত্ন অবহেলায় এখন বিবর্ন। গৌরনদীসহ পার্শবর্তী এলাকার যুবক,ছাত্র,শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের জ্ঞান আহরনের জন্য সরব ছিল এ প্রতিষ্ঠানটি। সংরক্ষনের অভাবে আজ এটি ধ্বংশের দারপ্রান্তে। শহিদদের স্বৃতিগাঁথা এই প্রতিষ্ঠানটির এমন অবস্থার জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল।

প্রতিষ্ঠানটি পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য কতৃপক্ষের কাছে জোর দাবী জানিয়েছেন এলাকার শিক্ষিত বিশিষ্ঠজন। ১৯৭৫ সালের ৭মে বিশিষ্ট রাজনিতিবীদ,সাংবাদিক,আইনজীবী এবং বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর ছোট ভগ্নিপতি শহিদ আবদুর রব সেরনিয়াবাদ মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের স্বরনে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। ইচ্ছে ছিল শহিদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বরনে স্বৃতিসৌধ নির্মান এবং শহিদ স্বৃতি পাঠাগার তৈরী করা। ঢাকা-বরিশাল মহা-সড়কের পাশে সরকারি গৌরনদী কলেজ, সরকারি গৌরনদী পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও গৌরনদী কেন্দ্রীয় মসজিদের সম্মুখ ভাগে প্রায় ১৪ শতক জমির উপর এ প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল।

এলাকার বর্ষীয়ান অনেকেই বলেছেন শহিদ আবদুর রব সেরনিয়াবাদের চিন্তাধারা ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের দেশ প্রেমের স্বৃতি ধরে রাখার জন্য একটি স্বৃতিসৌধ ও পাঠাগার নির্মান। আর পাঠাগারটি দিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে যুব সমাজকে জ্ঞানের আলোতে প্রবেশ করানো। অবিভক্ত গৌরনদীসহ পার্শবর্তী এলাকার যুবক,ছাত্র,শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের জ্ঞান আহরনের জন্য সরব ছিল এই শহিদ স্বৃতি পাঠাগার। এখানে ছিল বিভিন্ন ভাষার দুর্লভ অনেক গ্রন্থ, ধর্মীয় গ্রন্থ ও প্রতিদিনের বাংলা ও ইংরেজী এবং সাপ্তাহিক পত্রিকা। ছিল পরিচালনা কমিটি ও সহ¯্রাধিক সাধারন ও আজীবন সদস্য ।

জাতীয় পার্টির সময়ে শহিদ স্বৃতি পাঠাগার নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরন করা হয় গৌরনদী পাবলিক লাইব্রেরী। ওখানে শহিদদের জন্য কোন স্বৃতিসৌধ আজও নির্মিত হয়নি। সরকারি গৌরনদী কলেজের শিক্ষকরা যতদিন প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেছিলেন ততদিন ভালোই চলছিল। বিএনপি জোট সরকারের আমলে এ প্রতিষ্ঠানের দুটি কক্ষ বিএনপির লোকজন দখল করে নেয়। একটিতে ক্রীড়া সংস্থার অফিস করা হয়। সেখান থেকেই অধপতন শুরু। এরপর ২০০৭ সালে শহিদ স্বৃতি পাঠাগার নাম দিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হলে কিছু দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। ১৯ বছর এই গ্রন্থাগারের লাইব্রীয়ানের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম জানান, পদাধিকার বলে এ গ্রন্থাগারের সভাপতির দায়িত্ব পালন করতেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

নির্বাচন ছাড়া সাধারন সম্পাদক পদে একজন দায়িত্ব পালন করতেন। মূলত সাধারন সম্পাদকই পরিচালনা করতেন সব কার্যক্রম। আমি লাইব্রীয়ানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সরকারী গৌরনদী কলেজের শিক্ষকরাই বিভিন্ন সময় সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সরকারি অনুদান বলতে জাতীয় গ্রন্থাগার থেকে ৭হাজার টাকার একটা বাজেট ছিল তাও আবার নগদ দেয়া হত না ৭ হাজার টাকার বই কিনে আনতে হত। মূলত সদস্যদের চাঁদা ও বিশিষ্টজনদের অনুদানে চলত এ প্রতিষ্ঠান। কলেজের শিক্ষকরা যতদিন চালিয়েছেন ততদিন ভালোই চলছিল। আমি ২০০৭ইং সালে ওখান থেকে চলে আসি। অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী ব্যবসায়ী এবং এ প্রতিষ্ঠানের আজীবন সদস্য মিলন কুমার সরকার বলেন ঐতিয্যবাহী পাঠাগারটি শুধু পাঠকের আত্মার খোরাকই জোটায়নি তরুনদের সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে বাচাঁরও একটি কারখানা ছিল।

গৌরনদীর অনেক উন্নয়ন হয়েছে। কিন্ত এ জ্ঞানভান্ডারের নাজুক অবস্থা আমাদের বিদ্ধ করছে। আমাদের শৈশবের সেই স্বৃতিমাখা জ্ঞান ভান্ডারের কাছে যখন যাই অনেক খারাপ লাগে প্রতিষ্ঠানটির নাজুক অবস্থা দেখে। শহিদ স্বৃতি পাঠাগারের আজীবন সদস্য (অব:) সহকারি অধ্যাপক মো: আবদুল মালেক এ প্রতিনিধিকে বলেন পাঠাগারটি খুব প্রানবন্ত ছিল। অনেক দুর্লভ গ্রন্থ ছিল। আমাদের অবসর সময়টা ছাত্র,শিক্ষক,সরকারি কর্মকর্তা,প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষের একটি মিলন মেলা ছিল। আমাদের শিক্ষকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষনীয় ছিল বিভিন্ন সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ভাষার গবেষনামূলক গ্রন্থ।

প্রতিষ্ঠানটিকে পুনর্জ্জীবিত করার দাবী জানাচ্ছি। তিনি আরো জানান ভবনটি ভেঙ্গে বহুতল ভবন করে কিছু অংশ ভাড়া দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন করা যায়। আমি মাননীয় সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর একান্ত সুদৃস্টি কামনা করছি ওনার পিতার স্বৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়ার জন্য । গৌরনদী পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর আতিকুর রহমান সামীম এ প্রতিনিধিকে বলেন,পৌর মেয়র হারিছুর রহমান ভাইর সাথে স্থানীয় সংসদ সদস্য জননেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ মহোদয়ের বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হয়েছে এটাকে আধুনীকায়ন করার জন্য, করোনা মহামারির কারনে একটু বিলম্ভ হচ্ছে ।

এই বিভাগের আরো খবর

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.