একজন প্রখ্যাত আবৃত্তিশিল্পী সীমা ইসলাম

আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল

0 262

দুই বাংলার আবৃত্তি জগতে একটি সুপরিচিত নাম সীমা ইসলাম। যার কন্ঠের যাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হন দর্শক-শ্রোতা। যার কন্ঠ বিমোহিত করে রাখে শ্রোতাদের। তিনি সীমা ইসলাম। দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিকার। গুণী এই শিল্পীর একটি বড় পরিচয় হলো-তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের একজন আইনজীবী।

সীমা ইসলাম নজরুল ইনস্টিটিউটের একজন সফল আবৃত্তি ট্রেইনার। বাংলাদেশের প্রথম সারির আবৃত্তি শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। দেশের বাইরেও তিনি সফল আবৃত্তিকার হিসেবে বহুল পরিচিত ও সমাদৃত। বাংলাদেশের এ যাবৎকালের আবৃত্তিকারদের মধ্যে তার কন্ঠ এতটাই স্বতন্ত্র এবং স্বমহিমায় সমুজ্জল যে, হাজারো কন্ঠের ভিড়ে তার কন্ঠ সহজেই চেনা যায়। এছাড়াও তিনি একজন জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বও। তিনি বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারের একজন তালিকাভুক্ত আবৃত্তিশিল্পী। আবৃত্তির পাশাপাশি রেডিও, টেলিভিশনে উপস্থাপনা, ধারা বর্ণনাও করেন তিনি। তাছাড়া এনটিভি, এটিএন বাংলা, বৈশাখী টিভি, চ্যানেল আই, আরটিভি, মাইটিভি ও মাছরাঙা টিভিসহ অনেক টিভিতেই তার আবৃত্তি সম্প্রচার হয়েছে।

দুই বাংলার খ্যাতিমান এই বাচিকশিল্পী সীমা ইসলাম এসেছিলেন নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যরে লীলাভূমি শ্রীমঙ্গলের অপরূপ রূপে মুগ্ধ হয়ে শ্রীমঙ্গল ভ্রমণে। উঠেছিলেন শ্রীমঙ্গলের রাধানগরে অবস্থিত ‘বৃষ্টি বিলাস’ গেষ্ট হাউজে। সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত ও প্রখ্যাত এই আবৃত্তিশিল্পী সীমা ইসলামের সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের।

সীমা ইসলাম বলেন, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালীন আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন মানিকগঞ্জে। সেখান থেকে উপজেলা, জেলা পর্যায়ে কৃতিত্বের সাক্ষর রেখে ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এরপর থেকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। এখন আবৃত্তি তার ধ্যাণ, জ্ঞান আর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২ মে মানিকগঞ্জের ঘিওরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। মানিকগঞ্জের কৃতিসন্তান সীমা বিএ (অনার্স), এম এ শেষ করেন ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৯৩ সালে।  ঢাকা ‘ল’ কলেজ থেকে এলএলবি করে ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। জীবনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মেধা ও মননে তিনি নিজেকে এগিয়ে নিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। অত্যন্ত সজ্জন, সুহৃদ, অনুসন্ধিৎসু ও ভ্রমণ বিলাসী এই বলিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী সীমা ইসলাম এক জীবন্ত কিংবদন্তী।

সীমা জানান, ১৯৯৩ সালে তার প্রথম আবৃত্তির ক্যাসেট বের হয়। নজরুল ইনষ্টিটিউট থেকে বের হওয়া পাঁচটি সিডিতে তার আবৃত্তি রয়েছে। ২০১৬ সালে ‘অন্তরে মোর কবিতা’ শিরোনামে ডিভিডি বের হয়, যাতে সীমার ২২টি কবিতা রয়েছে। এছাড়াও বাঁশরীর প্রযোজনায় বৈশাখী টিভিতে ফাতেমা-তুজ-জোহরা’র সাথে কাজী নজরুলের গান ও কবিতায় অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। চ্যানেল আই এর ‘গান দিয়ে শুরু’ অনুষ্ঠানে শিল্পী ফেরদৌস আরার গানের সাথে সীমার আবৃত্তির যুগলবন্দী প্রচারিত হয় গত বছরের ১৯ জানুয়ারি। এছাড়াও দেশের প্রায় সব কটি টিভি চ্যানেলে সীমার আবৃত্তি সম্প্রচার হয়েছে।

তিনি জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, মৌলভীবাজার, রংপুর, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, খুলনা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কবিতা সংগঠনের আমন্ত্রণে ট্রেইনার, অতিথি ও আবৃত্তির অনুষ্ঠান ও উৎসবে যোগদান করেছেন। ২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর মাছরাঙা টেলিভিশনের রাঙ্গাসকাল অনুষ্ঠানে তার জীবন ও কর্ম নিয়ে এক ঘন্টার লাইভ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। নিউইয়র্কের সানম বাংলা অনলাইন টেলিভিশন চ্যানেলে সর্বপ্রথম সীমা ইসলামের একক আবৃত্তি সম্প্রচার হয়। কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়া থেকে আবৃত্তি উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছেন।

গুণী এই শিল্পী আরো জানান, ২০১১ সালের ২৪-২৫ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও উদ্ধোধক ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নজরুল গবেষক, নজরুল ভক্ত এবং শিল্পীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নজরুল ইনষ্টিটিউট আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সীমা ইসলাম কাজী নজরুলের ‘নারী’ কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন।

তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে শরৎচন্দ্রের বাসভবনে ২০১৮ সালে একটি কবিতার অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেছিলেন। এ ছাড়াও কলকাতায় অবস্থিত বিভিন্ন সংগঠনের আমন্ত্রণে তিনি বহুবার কলকাতায় কবিতা উৎসবে যোগদান করেছেন এবং কবিতা আবৃত্তি করে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন। এসব সংগঠনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রবীন্দ্রসদন, চুরুলিয়া নজরুল একাডেমি মঞ্চ, শিশির মঞ্চ, কলকাতা নিউ টাউন নজরুল তীর্থ, অগ্নিবীণা প্রভৃতি। প্রাণের টানে তিনি গত বছর কবিগুরুর জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ী ও শান্তি নিকেতন দেখতে যান। সীমা আরো বলেন, আবৃত্তির এক অনুষ্ঠানে মোস্তফা জামাল আব্বাসী সীমাকে মা বলে ডেকেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন, এই মেয়ে-তুমি কি করে নজরুলের কবিতার ভেতরে এমনভাবে প্রবেশ করলে আমি আশ্চর্য হয়েছি। সীমার আবৃত্তি নিয়ে তিনি দু’বার জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলেন।

সীমা ইসলামের ইউটিউব চ্যানেলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’, কাজী নজরুলের ‘আগমণী’, ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘রবি ঠাকুরের হঠাৎ দেখা’, জীবনানন্দ দাশের ‘বছর কুড়ি পরে’,-প্রভৃতির কবিতা সন্নিবেশিত করা হয়েছে।

কলকাতার কবিতাবেলা হচ্ছে ভারতের বাংলা ও বাংলাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের জন্য একটি কবিতাতীর্থ। কবিতাবেলা সেই প্রতিষ্টান যারা কবিতাকে লালন, পালন এবং ধারণ করেন শুধুমাত্র প্রাণের ভালোবাসা দিয়ে। সেই কবিতাবেলার আমন্ত্রণে তিনি কলকাতায় গিয়েছেন অনেকবার। একজন আবৃত্তিশিল্পী হিসেবে সীমা ইসলাম কলকাতার বিভিন্ন সংগঠনের আমন্ত্রণে কবিতা উৎসবে যোগ দিয়ে আবৃত্তি করে মানুষের মন জয় করেছেন।

ওয়াইজঘাটের নজরুল সম্মেলনে প্রায় ৫০০ জনের মধ্যে কাজী নজরুলের রণসংগীত চল চল চল-এটি কবিতা আকারে কোরাসের লিড দিয়েছিলেন সীমা। এ অনুষ্ঠানে সভাপতি ছিলেন কবি নাতনি খিলখিল কাজী। অনুষ্ঠান শেষে খিলখিল কাজী সীমাকে বললেন-তুই এটা এভাবে কলকাতাতেও করবি। খুব ভালো হয়েছে। জানালেন সীমা।

সীমা ইসলামের আবৃত্তি জীবন ও বর্ণাঢ্য জীবনে বাংলাদেশ-ভারত দু জায়গা থেকেই পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা। নজরুল আবৃত্তির অনন্য কন্ঠ হিসেবে নজরুল চর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান অগ্নিবীণা (বাংলাদেশ) কর্তৃক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতি পদক ১৪২৪ লাভ করেন। কলকাতায় চোখ পত্রিকা উভয় বাংলা থেকে প্রখ্যাত বাচিকশিল্পী হিসেবে বঙ্গবন্ধু বিজয় স্মারক ১৪২৫ লাভ করেন। খঙ্গপুর সোনার তরী থেকে সম্মাননা স্মারক পান ২০১৮ সালে। চুরুলিয়া নজরুল একাডেমি থেকে পেয়েছেন সম্মাননা স্মারক। ঢাকার অগ্নিবীণা থেকেও পেয়েছেন সম্মাননা। ভারত-বাংলাদেশ নজরুল সঙ্গীত সম্মেলন-২০১৮ তে অগ্নিবীণা আয়োজিত অনুষ্ঠানে সম্মাননা স্মারক পেয়েছেন তিনি। আগরতলা কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় জন্মশতবর্ষ উদযাপন-২০১৮ অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। নজরুল চর্চা কেন্দ্র, বারাসাত আয়োজিত আন্তর্জাতিক নজরুল উৎসব-২০১৮তে তিনি কবি নজরুল সম্মাননা পান। এছাড়াও আরো অনেক পদকে ভূষিত হয়েছেন তিনি।

এই বিভাগের আরো খবর

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.