জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তির শক্তি কাজে লাগিয়ে ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা, কূটনীতির ভাষা, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার প্রভাব তুলে ধরেন ড. ইউনূস।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।
ড. ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্ব কূটনীতিতে অনেক সময় শব্দের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যায়। এতে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণা নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশন শব্দের স্পষ্টতা ও প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকে নিবদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচির কথা বলেন। তিনি জানান, এই কর্মসূচি দেখিয়েছে উন্নত বিশ্বেও কীভাবে প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
২০০৮ সালে নিউইয়র্কে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলার ঋণ দেওয়ার সীমা নিয়ে কার্যক্রমটি শুরু হয়। এখন পর্যন্ত কর্মসূচিটির মাধ্যমে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ঋণ পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় এনে কার্যক্রমটি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আমানত গ্রহণ ও সঞ্চয় ব্যবস্থাপনায় কিছু আইনি বাধা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সামাজিক ব্যবসার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখ দিতে পারে। তবে অন্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারা আরো বড় আনন্দ। সামাজিক ব্যবসা মুনাফাকেন্দ্রিক না হয়ে মানুষের সমস্যা সমাধানের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
তিনি জানান, বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার আওতায় ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামীণ ফোনের সুবিধা ব্যবহার করে দূরবর্তী এলাকার মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সেবা নিতে পারছেন। এ ছাড়া একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ চক্ষু হাসপাতাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এই নেটওয়ার্ক নিজেদের উদ্বৃত্ত আয় থেকেই নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করতে পারছে।
তরুণদের উদ্দেশে ড. ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা মানুষকে মূলত চাকরিপ্রত্যাশী করে তোলে। অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা।
এই ধারণাকে সামনে রেখে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের শুধু সনদের পেছনে না ছুটে সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করবে।
দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নেট কার্বন নিঃসরণমুক্ত পৃথিবী গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান ড. ইউনূস।


✍️ মন্তব্য লিখুন