সদরঘাট নদীবন্দর ও বাদামতলীর ফলের আড়ত ঘিরে হাজারো মানুষের জীবিকা চলে। তাদের অনেকে ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী। পরিবার গ্রামে থাকায় এসব মানুষের ঢাকায় থাকার জায়াগা নেই। সারা দিন কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজেন তারা। এসব মানুষের জন্য বুড়িগঙ্গার বুকে নোঙর করা পুরোনো লঞ্চের ছোট্ট একটি কেবিনই হয়ে উঠেছে রাতযাপনের আশ্রয়।
সরেজমিন দেখা গেছে, ছোট ছোট কেবিনের মতো কক্ষগুলোতে কেউ ঘুমাচ্ছেন, কেউ বিশ্রাম নিতে নিতে গল্প করছেন। আবার কেউ পরদিনের ব্যবসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব হোটেলে এক রাত থাকার জন্য সিঙ্গেল কক্ষের ভাড়া ১২০ টাকা, আর ডাবল কক্ষের ভাড়া ১৫০ টাকা। তবে এসব ভাসমান হোটেলে থাকার ব্যবস্থা থাকলেও খাবার সরবরাহ করা হয় না। অতিথিদের নিজেদেরই খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়।
ভাসমান হোটেলে কথা হয় ফল বিক্রেতা মো. মাইন উদ্দীনের সঙ্গে। জীবিকার তাগিদে লঞ্চে লঞ্চে ফল বিক্রি করেন তিনি। তার পরিবার থাকে চাঁদপুরে। ব্যবসার কারণে ঢাকায় থাকতে হয় একাই। দুই মাস পরপর বাড়ি যান তিনি। প্রতিদিন সকালে বাদামতলীর ফলের আড়ত থেকে ফল কিনে দুপুর বা বিকেলে লঞ্চে ওঠেন। সেখানে ফল বিক্রি করে রাতে কিংবা পরদিন সকালে ফিরে আসেন। ঢাকায় নিজের কোনো ঘর না থাকায় কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়া ও রাত কাটানোর জন্য এই ভাসমান হোটেলই তার ভরসা। এভাবেই বছরের বেশির ভাগ সময় কাটে তার।
তিনি বলেন, কক্ষের সঙ্গে দেওয়া হয় তালা-চাবি। ভেতরে রয়েছে ফ্যান, বালিশ, তোশক ও চাদরের ব্যবস্থা। টয়লেটও রয়েছে। গোসলের জন্য কখনো নদীর পানি ব্যবহার করি, আবার কখনও এক গ্যালন পানি কিনে নেই।
ভাসমান হোটেলে রাত কাটানো সবুজ মিয়া নামে এক রিকশাচালক বলেন, বাসাবাড়ি বা হোটেলে থাকার সামর্থ্য আমাদের নেই। আগে রিকশার সিটেই রাত কাটাতে হতো। পরে এই ভাসমান হোটেলের সন্ধান পেয়ে এখানেই রাত কাটাই। কম খরচে মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই পেয়েছি।
ভাসমান হোটেলের বাসিন্দাদের মধ্যে রয়েছেন পান-সুপারি বিক্রেতারাও। দিনের কাজ শেষে কেউ ফলের ঝুড়ি পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কেউ রাতের অবসরে বসে বসে সুপারি কাটেন। তাদেরই একজন মো. সুরুজ মিয়া। তার দিন শুরু হয় সোয়ারীঘাট থেকে পান-সুপারি কিনে। সেসব নিয়ে সদরঘাট ও বিভিন্ন লঞ্চে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন তিনি। ব্যবসার টানে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটে লঞ্চঘাটেই। পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ফেরা প্রায় ছেড়ে দিয়েছেন সুরুজ মিয়া। আপনজনদের কাছ থেকে দূরে সরে এসে এখন এই সদরঘাট এলাকাকেই নিজের চেনা ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছেন। জীবিকার পাশাপাশি বিভিন্ন মাজারে ঘুরে বেড়ান। কখনো কখনও রাত কাটে সদরঘাটের ভাসমান হোটেলে।
এদিকে ভাসমান হোটেলে বেশ কিছুদিন ধরে থাকছেন রাসেল। প্রয়োজনে ঢাকা আসলেই এখানে থাকেন তিনি। তার ভাষায়, নদীর ঢেউয়ে লঞ্চের মৃদু দুলুনি তার কাছে বেশ উপভোগ্য। টার্মিনালের কোলাহল থেকে দূরে হওয়ায় এখানে তুলনামূলক নিরিবিলি পরিবেশও পান তিনি। বর্ষাকালে প্রকৃতির সৌন্দর্য আর টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ তার ভালো লাগার অন্যতম কারণ।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাসেল বলেন, বেশ কিছুদিন ধরেই এখানে আছি। ঢেউয়ের ওপর লঞ্চের দুলুনি আমি খুবই উপভোগ করি। টার্মিনাল থেকে যথেষ্ট দূরে হওয়ায় এখানে বেশি শব্দ নেই। বর্ষাকালে সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা যায়, টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ শুনতে পাই।
ভাসমান হোটেল ‘শরীয়তপুর মুসলিম বোর্ডিং’-এর মালিক সবুজ মিয়া। প্রায় সাত বছর আগে জাহাজের ডকইয়ার্ড থেকে একটি পুরোনো লঞ্চ কিনে সেটিকে আবাসিক হোটেলে রূপ দেন তিনি। সেই থেকে লঞ্চটিই তার ব্যবসার কেন্দ্র।
সবুজ মিয়া জানান, হোটেলটিতে মোট ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর এসব কক্ষের বেশির ভাগই ভাড়া হয়ে যায়। কোনো কোনো দিন দু-চারটি কক্ষ খালি থাকলেও সাধারণত প্রায় সব কক্ষেই অতিথি থাকেন। ভাড়া নেওয়া প্রতিটি কক্ষের জন্য অতিথিদের দেওয়া হয় তালা-চাবি। রাত কাটানোর জন্য কক্ষে রয়েছে বালিশ, তোশক, চাদর ও ফ্যানের ব্যবস্থাও। এভাবেই পুরোনো লঞ্চের কক্ষগুলোকে স্বল্প খরচে রাতযাপনের উপযোগী করে তুলেছেন তিনি।


✍️ মন্তব্য লিখুন