রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে বেসরকারি সংস্থা রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় অভিযুক্ত সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নেতারা। এ ঘটনায় সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজীকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রভাবশালী সদস্যরা ধরা পড়েনি। গত দুদিনে পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের অনেকেই শাহ আলী এলাকার ভাড়াটে।
গতকাল রোববার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, মিরপুর-১ এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের ধ্বংসস্তূপের সামনে বসে দ্বিতীয় দিনেও প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। তবে সেটি সীমিত পরিসরে।
জুলিয়া বেগম নামে এক নারী জানান, তিনি তাঁর ছয় মাস বয়সী মেয়েকে টিকা দিতে নিয়ে এসেছেন। বাসার কাছে হওয়ায় এখান থেকে টিকা দেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ হামলায় যারা জড়িত, তাদের উপযুক্ত বিচারের দাবি জানাই। প্রতিষ্ঠানের স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, আগে এই কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জনকে সেবা দেওয়া হতো। গতকাল সেবা নিয়েছেন ৪৭ জন।
ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সহকারী কমিশনার জাকির হোসেন সমকালকে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ ও মামলার তদন্তে তাদের জড়িত থাকার তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে যাদেরই নাম আসবে, গ্রেপ্তার করা হবে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে কয়েকশ লোক জড়ো হয়ে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। পরে হামলাকারীরা সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় পরদিন শাহ আলী থানায় একটি মামলা করেন রাড্ডার নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার। মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়াসহ ২০০-২৫০ জনকে আসামি করা হয়।
সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি সরকারের রেজিস্টার্ড। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়। এতে সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা, সহসভাপতি কামাল উদ্দিন আহম্মদ, সম্পাদক মজিবুর রহমান গাজী, কোষাধ্যক্ষ কামাল হোসেন, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ, মোহাম্মদ ছাকাওয়াত উল্ল্যাহ, আল-আমিন, কবির হোসেন গাজী ও আবু বকর ছিদ্দিক। তবে সমবায় অফিসের কাছে জমা দেওয়া এই ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সহসভাপতি পদে ‘কো-অপ্ট’ করা হয় কাজী মকবুল হোসেন এবং সম্পাদক পদে শাহ আলম গাজীকে।
সমিতির একাধিক সদস্য ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির বর্তমান সদস্য ৯১ জন। এর মধ্যে সদস্য রয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বিএনপি নেত্রী ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য হানিফ মিয়া, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সাবেক সদস্য সচিব মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেল, আব্দুর রহমান হাজরা, মাহবুবুর রহমান শান্ত ও মনির হোসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় স্থানীয় যুবদল, ছাত্রদলের নেতারা নানা ভূমিকায় ছিলেন। ভাঙচুরে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মুখোশ পরা ছিল। এ ছাড়া শাহ স্মৃতি মার্কেটের নুরুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী ভাঙচুরে জড়িত ছিলেন।
এ ঘটনায় পুলিশ সমিতির সম্পাদক শাহ আলম গাজীসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। অন্যরা হলেন– শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, আতিকুর রহমান, কামরুল ইসলাম, শাকিল, সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান ও রাব্বি। তাদের সবাইকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
১৪ জন দুই অংশেরই সদস্য
মিরপুর-১ নম্বরে ১০ কাঠা জমির ওপর স্থাপিত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ৫০ বছর ধরে গরিব, অসহায় মা ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে আসছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়ে নব্বইয়ের দশকে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড গঠন করা হয়। ২০০১ সালের দিকে সমিতিটি ভাগ হয়ে যায়। একই রেজিস্ট্রেশন থাকলেও দুটি কমিটি করা হয়। একটিতে বর্তমানে সদস্য ৫৬ জন। তবে বর্তমানে এই অংশের কোনো কমিটি নেই। সমিতির অন্য অংশের সভাপতি মিজানুর রহমান হাজরা। এ কমিটির অধীনে সমিতির সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিসহ ৯১ জন। এর মধ্যে ১৪ জন দুই অংশেই রয়েছেন বলে জানা যায়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০০৬ সালে এই সমিতি জমিটি বরাদ্দ পায়। তৎকালীন স্থানীয় কাউন্সিলর ও সমিতির সদস্য মিষ্টি সেটি বরাদ্দের টাকাও জমা দেন। ২০২১ সালের দিকে সমিতির নামে জমিটি রেজিস্ট্রেশন হয়। কিন্তু দখল হয়নি। এরই মধ্যে সমিতির অন্য অংশ আদালতে একটি মামলা করে। সে মামলা চলমান।
মালপত্রের একটি অংশ বিক্রি হয় ভাঙাড়ির দোকানে
মামলার বিবরণী অনুযায়ী, ঘরে থাকা আসবাব ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করা হয়। আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করা হয়। বিভিন্ন ওষুধ ও সামগ্রী, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্রিজ, এসি ও স্টিলের আলমারি নিয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লুট হওয়া মালপত্রের কিছু অংশ স্থানীয় কয়েকটি ভাঙাড়ি দোকানে পাওয়া যায়। ভাঙচুরের সময় ব্যবহার করা এক্সক্যাভেটরটি স্থানীয় এক ছাত্রদল নেতা নিয়ে এসেছিলেন। আর ঘটনার সময় একটি গাড়িতে করে স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের নেতারা আশপাশে অবস্থান করেছে। ঘটনার সময়ের একটি সিসিটিভি ফুটেজে সাদা রঙের মাইক্রোবাসও দেখা গেছে।
দায়িত্বে গাফিলতি, ওসি প্রত্যাহার
রাড্ডা সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গত শনিবার পুলিশ তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ কমিটিকে শনিবারই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে শাহ আলী থানার ওসির দায়িত্বে গাফিলতি পেয়েছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত কমিটির সূত্রে জানা যায়, দখলের বিষয়টি শাহ আলী থানার সদ্য সাবেক ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানতেন। কিন্তু তিনি আইনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। সিনিয়র কর্মকর্তাদেরও যথাসময়ে বিষয়টি অবহিত করেননি। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে ঘটনাটি জানার বেশ কিছু সময় পর তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তিনি নীরব দর্শকের মতো ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশও করা হবে।
এদিকে ঘটনার দুই দিন পর গতকাল ‘প্রশাসনিক কারণ’ দেখিয়ে শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। তাঁকে কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।
ধ্বংসযজ্ঞ দেখে মর্মাহত প্রতিমন্ত্রী
প্রয়োজনীয় সংস্কার করে সোমবার থেকেই রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। রোববার সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে তিনি বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র মানুষের সেবা দিয়ে আসা এ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া হবে না। আগামীকাল (আজ) থেকেই আমরা কেন্দ্রটি সংস্কারের কাজ শুরু করব।
আইনি দাবি থাকলে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উত্থাপন করতে পারে। রাতের অন্ধকারে বুলডোজার দিয়ে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভেঙে ফেলার অধিকার কারও নেই বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
এমপির নেতৃত্বে ধ্বংসযজ্ঞ– আসিফ মাহমুদ
দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, বিএনপির একজন সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির নেতৃত্বে আমরা দেখলাম ধ্বংসযজ্ঞ, লুটতরাজ, একটা মবতন্ত্র কায়েম করা হলো। গরিব মানুষের গরিব বাচ্চাদের এই যে টিকা লুট করে আপনারা কী প্রমাণ করতে চান? আপনারা ধনীদের থেকে চাঁদাবাজি করেন, ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদাবাজি করেন। ইসিবিতে আমরা দেখলাম, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে আপনারা ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন।
রোববার দুপুর ১২টার পর আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে এনসিপির একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসে। এ সময় সেখানে লাগানো ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর একটি সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন এনসিপির কর্মীরা। আরেকটি সাইনবোর্ড কালো কালি দিয়ে মুছে দেন এবং ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন।
দুপুরে রাড্ডা সেন্টার পরিদর্শন শেষে চিকিৎসক ও রাজনীতিক তাসনিম জারা বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর চলার পরও পুলিশ কেন তা ঠেকাতে পারেনি? এমন পরিস্থিতি থাকলে মানুষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কীভাবে আস্থা রাখবে? পুরো ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।


✍️ মন্তব্য লিখুন