হৃদয় দিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ করুন

ডেস্ক রিপোর্ট

0 19

এই গ্রহে মানুষের মৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হৃদরোগ। Use Heart to Beat Cardiovascular Disease (CVD), অর্থাৎ ‘হৃদয় দিয়ে হৃদরোগ প্রতিরোধ’—এটি এ বছর বিশ্ব হার্ট দিবসের স্লোগান। করোনাকালে এই স্লোগানের ব্যাপক তাৎপর্য। জীবন-জীবিকার দ্বন্দ্বে মানুষ এখন বের হচ্ছে ঘরের বাইরে। বেড়েছে ভাইরাসের চলাচল।

বেড়েছে করোনায় হৃদরোগের ঝুঁকি। এমনকি রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনাযুদ্ধ কবে শেষ হবে, আমরা জানি না। তাই নিউ নরমাল জীবনে হৃদরোগ প্রতিরোধ বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথম হার্ট দিবসটি পালন করা হয় ২০০০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর এবং ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ রোববার বিশ্ব হার্ট দিবস হিসেবে পালন করা হতো। ২০১১ সাল থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়।

হৃৎপিণ্ড একটি পেশিবহুল অঙ্গ, যা রক্ত সঞ্চালনব্যবস্থার রক্তনালিগুলোর মাধ্যমে রক্ত পাম্প করে। রক্ত শরীরকে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ করে হার্টের গায়ে লেপ্টে থাকা করোনারি ধমনির মাধ্যমে। হৃৎপিণ্ড চারটি চেম্বারে বিভক্ত করা হয় : ওপরের বাঁয়ে ও ডানে অ্যাটরিয়া এবং নিচে বাঁয়ে ও ডানে ভেন্ট্রিকলস।

বাংলাদেশের মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো হৃদরোগ। প্রতিবছর বিশ্বে যে পরিমাণ লোক মারা যায়, তার ৩১ শতাংশ মারা যাচ্ছে হৃদরোগে। এখন যে হারে হৃদরোগ হচ্ছে, তাতে ২০৩০ সালে বিশ্বে ২৩ মিলিয়ন লোক মারা যাবে। হৃদরোগে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। ভৌগোলিক কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলদেশ, ভারতসহ এ অঞ্চলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি। কারণ, আমাদের দেশের মানুষ অল্প বয়সে ধূমপান করে, চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খায়। কোন খাবার স্বাস্থ্যকর আর কোনটা অস্বাস্থ্যকর, সে বিষয়ে আমাদের দেশের অনেকেরই ধারণা কম। আবার ভৌগোলিক কারণে এ দেশের মানুষের উচ্চতা কম। এর ফলে তাদের হার্টের করোনারি আর্টারি (ধমনি) সরু থাকে, যা সাধারণত অল্পতেই কোলেস্টেরলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। তার ওপর করোনায় বেড়েছে হৃদরোগের ঝুঁকি।

করোনাভাইরাস, যার পোশাকি নাম কোভিড-১৯, সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশও অপেক্ষায় আছে একটি কার্যকর ভ্যাকসিনের। যদিও যেকোনো বয়সেই এ ভাইরাসের শিকার যে কেউ হতে পারে। তবুও যাদের হৃদরোগ, শ্বাসকষ্টের রোগ, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ইত্যাদির মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ রয়েছে, তাদের মধ্যে একটু বেশি ভীতির সঞ্চার করেছে। এর কারণ, করোনাভাইরাস সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগে যাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের অনেকেই আক্রান্ত ছিলেন হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, সিওপিডি, ডায়াবেটিস ইত্যাদির মতো ক্রনিক রোগে। বাংলাদেশেও কোভিড-১৯ রোগে প্রথম মৃত্যুবরণকারী রোগীটিও ছিলেন হৃদরোগী, যাঁর হার্টের করোনারি ধমনিতে রিং পরানো ছিল। এ ছাড়া আরো অনেক কোভিড-১৯ রোগী, যাঁরা হার্টের রক্তনালিতে ব্লকজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন, তাঁদের পরিণতি খারাপ হয়েছে। নতুন করেও অনেকে ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন করোনার ছোবলের পর।

করোনাভাইরাসের কারণে কী ধরনের হৃদরোগ হতে পারে অথবা যাঁরা ইতোমধ্যে হৃদরোগে ভুগছেন, তাঁদের কী কী সমস্যা হতে পারে—এ বিষয়ে আলোচনা করব এবং করণীয় নিয়ে আলোচনা করব।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হৃদরোগের নানা জটিলতা হয়ে থাকে। যাদের আগে হৃদরোগ ছিল না, তাদের নতুন করে হৃদরোগ হতে পারে। আবার যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ ছিল, তাদের নতুন করে জটিলতা হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত ধমনি শিরায় রক্ত জমাট বেঁধে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করে, যা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে সঠিকভাবে চিকিৎসা নিলে এবং সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি হলে মৃত্যুঝুঁকি হ্রাস পায়।

করোনাভাইরাস সংক্রমণে হার্ট অ্যাটাক

আগে ধারণা করা হতো, করোনাভাইরাস মূলত ফুসফুসের বেশি ক্ষতি করে এবং এ কারণে কোভিড-১৯ রোগীদের শ্বাসকষ্ট হয়। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ ভাইরাস হার্টের মাংসপেশির ক্ষতি করতে পারে। এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যেসব কোভিড-১৯ রোগী ভেন্টিলেটর সাপোর্টে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের প্রতি পাঁচজনের একজনের হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল এবং ফুসফুসের শ্বাসকষ্ট ছাড়াই মৃত্যু হয়েছিল। হার্ট করোনারি ধমনির মাধ্যমে পুষ্টি পায়। এই করোনারি ধমনিতে মারাত্মক ধরনের চর্বি দিয়ে যদি আংশিক ব্লক থাকে, করোনার প্রভাবে তা শতকরা শতভাগ ব্লক হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। এমনকি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এসব রোগীর শ্বাসকষ্টের সঙ্গে বুকে ব্যথাও হতে পারে। তবে তিনি যদি দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের রোগী হয়ে থাকেন, সে ক্ষেত্রে বুকে ব্যথা না-ও থাকতে পারে। ইসিজি ও রক্তের ট্রপোনিন আই নামক বায়োমার্কার পরীক্ষা করে হার্নিট অ্যাটাক নিশ্চিত হওয়া যাবে। টাইপ-১ ও টাইপ-২ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাক সঠিক সময়ে শনাক্ত করতে পারলে চিকিৎসাও সহজ হয়। টাইপ-১ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন এথেরোস্ক্লেরোসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত কিন্তু কোভিড-১৯ টাইপ-২ মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন, অর্থাৎ হাইপোক্সিয়া বা অক্সিজেনের অভাবজনিত কারণে হতে পারে, যা সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশ হয়েছে।

মায়োকার্ডাইটিস

মায়োকার্ডাইটিস হলো হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশির প্রদাহ। করোনাভাইরাসের কারণে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশিতে আঘাতের কারণে মায়োকার্ডাইটিস হতে পারে। মায়োকার্ডাইটিস হার্টের এমন একটি অবস্থা, যা থেকে রোগী এমনি এমনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যেতে পারে। আবার মারাত্মক জটিলতা হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। হার্টের ইকোকার্ডিওগ্রাফি পরীক্ষা করে এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে মায়োকার্ডাইটিস শনাক্ত করা যেতে পারে।

হার্ট ফেইলিউর হয়েও শ্বাসকষ্ট হতে পারে

হার্ট ফেইলিউর হলো হার্টের এমন একটি অবস্থা, যা দুই ধরনের হতে পারে। একটি হলো ক্রনিক হার্ট ফেইলিউর, যা আগে থেকেই রোগীর ছিল। এ ধরনের রোগীর হার্টের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে। অনেক রোগী বলে থাকেন হার্ট দুর্বল। হার্টের ইকোকার্ডিওগ্রাফি, বুকের ইসিজি ও এক্স-রে করেও জানা যেতে পারে। এ ধরনের রোগীদের হার্ট আকারে বড় হয়ে সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা কমে যায়। আর অ্যাকিউট হার্ট ফেইলিউর হঠাৎ করেই হতে পারে। হার্টের সংকোচন-প্রসারণ কার্যক্ষমতা লোপ পেয়ে রোগীর শ্বাসকষ্ট হতে পারে। গবেষকদের মতে, করোনাভাইরাসের কারণে অ্যাকিউট হার্ট ফেইলিউর হতে পারে। অথবা ক্রনিক হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের হঠাৎ করেই হার্টের মুমূর্ষু অবস্থা, অ্যাকিউট হার্ট ফেইলিউর হতে পারে।

করোনার প্রভাবে অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন

করোনাভাইরাসের ক্ষতির কারণে হৃৎপিণ্ডের স্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন ব্যাহত হতে পারে। হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে ট্যাকিকার্ডিয়া হতে পারে। ড্রপ বিটসহ বিভিন্ন ধরনের নানা নামের অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন হতে পারে। এ অবস্থাও এমনি এমনি ভালো হয়ে যেতে পারে, আবার বড় ধরনের সমস্যাও করতে পারে। তবে যেসব রোগী করোনাভাইরাসের প্রভাবমুক্ত হয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, তাঁদেরও পরবর্তী সময়ে কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে এবং চিকিৎসকের কাছে ফলোআপেরও প্রয়োজন আছে।

করোনায় হার্ট অ্যাটাক হলে করণীয়

পৃথিবীর সব দেশে প্রতিটি রোগব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে কোভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায়। আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি এবং অন্যান্য হৃদরোগবিষয়ক সোসাইটি অ্যাকিউট হার্ট অ্যাটাক হলে উপসর্গমাফিক চিকিৎসা বা ওষুধের দ্বারা চিকিৎসাকে সমর্থন করেছেন। সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের রোগী যদি হার্ট অ্যাটাকের পর দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে, তাহলে সরাসরি ক্যাথল্যাবে করোনারি এনজিওগ্রাম করে করোনারি এনজিওপ্লাস্টি করা হয়। এই চিকিৎসাকে বলা হয় প্রাইমারি পিসিআই। অর্থাৎ রক্তনালি ব্লক হলে হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে সঙ্গে করোনারি এনজিওগ্রাম করে ব্লকের চিকিৎসা বা রিং পরিয়ে দেওয়া হয়। তাতে রক্তনালিতে আবার রক্তপ্রবাহ হয়ে হৃৎপিণ্ডের মাংসপেশিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। এই চিকিৎসাকে সারা বিশ্বে হার্ট অ্যাটাকের আধুনিক চিকিৎসা হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ রোগের সঙ্গে হার্ট অ্যাটাক হলে রক্ত পাতলা করার বিশেষ ওষুধ দ্বারা এই চিকিৎসা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কমিয়ে যদি কোভিড ডেডিকেটেড ক্যাথল্যাবে চিকিৎসা গ্রহণ করা যায়, সে ক্ষেত্রে প্রাইমারি পিসিআই করে রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব।

হার্টের নিয়মিত আধুনিক চিকিৎসা করোনারি স্টেনটিংসহ সব ধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চিকিৎসা গাইডলাইন করা হয়েছে।

ধূমপান ও করোনাভাইরাস

ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাক করোনাভাইরাসের জন্য অবশ্যই একটি ঝুঁকি। করোনাভাইরাস ফুসফুসের অ্যালভিওলাকেও ক্ষতি করে। এ ছাড়া ধূমপান এমনিতে ফুসফুসের প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষতি করে এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়।

চীনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের মধ্যে ধূমপায়ীদের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে এবং পুরুষের মধ্যে এ ধূমপানের ক্ষতি বেশি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া যাঁরা অ্যাকিউট ডিসট্রেস সিনড্রোম নামক জটিলতায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে ধূমপানের ইতিহাস ছিল। এ ছাড়া ভাইরাস সংক্রমণে ধূমপান একটি কারণ হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও করোনাভাইরাস

যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তাঁদের ঝুঁকি আছে করোনাভাইরাসে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যদি অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকে। সে ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের ঝুঁকি বেশি। চীনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যুবরণকারী অনেকেই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন। তাই যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগ আছে অথবা পরিবারে এ ধরনের রোগের ইতিহাস আছে, তাঁদের সচেতন থাকতে হবে। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা সুনিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে।

স্টেনটিং ও বাইপাস সার্জারি রোগী

বাংলাদেশে যেসব রোগী এর আগে হৃৎপিণ্ডের করোনারি ধমনিতে ব্লকজনিত কারণে স্টেনটিং বা রিং পরিয়েছেন, অথবা বাইপাস সার্জারি করেছেন, তাঁদের মধ্যে ঝুঁকিজনিত আতঙ্ক দেখা যাচ্ছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না। এ ছাড়া নিয়মিত ফলোআপে থেকে এই ঝুঁকি কমিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত হতে পারেন। এ ছাড়া করোনায় আক্রান্ত হলে আরো যত্নের সঙ্গে হৃদয়ের সুরক্ষা নিতে পারেন।

হার্ট সতেজ রাখতে

হার্ট সতেজ রাখতে অভ্যাসে পরিবর্তন এনে হৃদরোগ থেকে আমরা নিজেদের রক্ষা করতে পারি। স্বাস্থ্য গবেষকেরা বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে সামান্য কিছু পরিবর্তন এবং কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাসের মাধ্যমে।

১. বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার খান

যেসব খাবারে প্রচুর আঁশ আছে, সেসব খাবার খাবেন। এসব খাবার কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে সাহায্য করে। বেশি আঁশ আছে এ রকম সবজির মধ্যে রয়েছে যেকোনো পাতা শাক, ঢেঁড়স, শিম ও মটরশুঁটি জাতীয় সবজি, কলাই ও ডালজাতীয় শস্য এবং ফলমূল। এ ছাড়া হোলগ্রেইন আটার রুটি এবং বাদামি চালেও আঁশ আছে।

২. ট্রান্সফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট-বাঁধা চর্বিজাতীয় খাবার কমিয়ে ফেলুন

যেসব খাবারে বেশি বেশি ট্রান্সফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট-বাঁধা চর্বি থাকে, সেসব খাবার খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফলে বেড়ে যায় হৃদরোগের ঝুঁকিও। ডালডা, চিজ, দুধের সর, লাল মাংস, মাখন, কেক, বিস্কিট ও নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে ট্রান্সফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট আছে। রান্নায় তেল ব্যবহারে যত্নশীল হতে হবে। তেল ছাড়া রান্না প্রায় অসম্ভব। অলিভ ওয়েল, সূর্যমুখী তেল, তিলের তেল, সয়াবিন, সরিষা, ভুট্টার তেল, ধানের কুঁড়ার তেল স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী। তবে একনাগাড়ে ব্যবহার না করে ১৫ দিন পরপর বদলে বদলে ব্যবহার করতে পারে। ভাজা বা রান্নায় বেশি তাপমাত্রায় তেল ব্যবহার না করা নিরাপদ। একটি নিরাপদ উপাদান সামান্য জ্বালেই রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। সম্ভব হলে টিস্যু বা শোষক কাগজ দিয়ে ভাজা খাবারের বাইরে সেঁটে থাকা তেল মুছে নিন। একই তেল বারবার ব্যবহার করাও ভালো নয়।

৩. খাবার টেবিলে লবণকে বিদায় জানান

লবণ বেশি খেলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে বৃদ্ধি পায় হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও। দিনে সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম (এক চা চামচ পরিমাণ) লবণ খাওয়া যেতে পারে। লবণ কমবেশি খাওয়া একটি অভ্যাসের ব্যাপার। লবণ যত কম খাওয়া হবে, তার চাহিদাও তত কমে যাবে। এই অভ্যাস বদলাতে মাত্র চার সপ্তাহের মতো সময় লাগে। এই সময় পর দেখা যাবে আপনি যে খাবারের সঙ্গে লবণ খাচ্ছেন না, সেটি আপনি বুঝতেই পারবেন না।

খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবণের পরিবর্তে মসলা দিয়ে খাবার প্রস্তুত করলে তা হৃদরোগের ঝুঁকি কমাবে। খাবারের সময় পাতে আলগা লবণ খাবেন না। লবণ ভাজা হোক আর কাঁচা হোক, একই গুণাগুণ। তাই অভ্যাস বদলে ঝুঁকি কমাতে পারেন।

৪. ভিটামিন ও মিনারেল-সমৃদ্ধ খাবার খান

যেসব খাবারে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ বেশি থাকে, সেগুলো আমাদের সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। শুধু তা-ই নয়, এসব খাবার হৃদরোগের ঝুঁকিও কমিয়ে দেয়। ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং পটাশিয়ামের মতো খনিজ উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ করে। হৃদরোগের যেসব কারণ আছে, সেগুলো ঠেকাতেও এসব খনিজ ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে। অনেক খাদ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডায়েটের মাধ্যমেই এসব ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া সম্ভব। এসবের জন্য ট্যাবলেটের ওপর নির্ভর করতে হবে না। তবে তার মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে ভিটামিন ডি। কারো শরীরে ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে যেসব খাবার খাওয়া প্রয়োজন—প্রতিদিন খাবারের তালিকায় অবশ্যই আঁশযুক্ত শাকসবজি এবং ফল রাখবেন।

৫. শরীরের ওজন বেশি হলে ক্যালরি কমিয়ে দিন

হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেওয়ার জন্য ওপরের চারটি ধাপ অনুসরণ করলেই আপনি ভালো থাকবেন। কারণ, আপনি যদি চিনি, লবণ, ট্রান্সফ্যাট চর্বিযুক্ত খাবার কম খান, ভিটামিন ও মিনারেল আছে এ রকম খাবার বেশি খান, তাহলে মোটা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। মনে রাখতে হবে, ওজন বাড়লে তা হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে কোমরে চর্বি জমা হলে। পুরুষের কোমর যদি ৩৭ ইঞ্চি আর নারীর কোমর ৩১ দশমিক ৫ ইঞ্চির বেশি হয় তাহলে ওজন কমাতে হবে। ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

৬. পর্যাপ্ত মানের ঘুম নিশ্চিত করুন

ঘুম বঞ্চনা আপনার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। যে ব্যক্তি পর্যাপ্ত ঘুম পান না, তাদের স্থূলত্ব, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিস এবং হতাশার ঝুঁকি বেশি থাকে। কিছু লোক অস্বাস্থ্যকর উপায়ে স্ট্রেস সহ্য করে। যেমন অতিরিক্ত খাওয়া, মদ্যপান বা ধূমপান। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ, শিথিলকরণ অনুশীলন বা ধ্যানের মতো চাপকে পরিচালনা করার বিকল্প উপায়গুলো সন্ধান করা আপনার স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করতে পারে।

চিকিৎসক-নির্ধারিত পরামর্শ গ্রহণ করে স্ট্রেস কমিয়ে ঘুম নিশ্চিত করুন এবং একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা-পরিকল্পনা অনুসরণ করুন। ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ এবং সেরিব্রোভাসকুলার ডিজিসহ কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ বাংলাদেশের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

অস্বাস্থ্যকর ডায়েট, তামাকের ব্যবহার এবং শারীরিক ক্রিয়াকলাপের অভাবের মতো আচরণগত ঝুঁকির কারণগুলো সমাধান করে রোগ প্রতিরোধ করুন। তবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

৭. ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম

প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটুন। প্রতিদিন নিয়মিত কিছু ব্যায়াম আপনার হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে। শারীরিক ক্রিয়াকলাপ আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে এবং আপনার উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ডায়াবেটিসের মতো পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা হ্রাস করতে সহায়তা করে। অনুশীলন রক্তে শর্করার মাত্রা হ্রাস করে, ক্যালরি পোড়ায় এবং কোলেস্টেরলের জটিলতা রোধ করতে সহায়তা করে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ স্ট্রেস থেকে মুক্তিও দেয় এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এবারের বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়ের আলোকে করোনাকালে নতুন বাস্তবতায় হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো এবং ইমিউনিটি বাড়াতে সবার প্রতি নিম্নলিখিত পরামর্শগুলো মেনে চলার জন্য বিনীত অনুরোধ রইল—

* যেকোনো নতুন উপসর্গ, যেমন—জ্বর, শ্বাসকষ্ট শরীরব্যথা অথবা ঘ্রাণশক্তি কমে যাওয়া ইত্যাদি হলে আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* কিছু রুটিন পরীক্ষা করে নিজের শরীরের আপডেট জেনে নিন।

* বুকে ব্যথা, চাপ অথবা শ্বাসকষ্ট হলে অবহেলা করবেন না।

* চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করবেন না। এ ছাড়া নতুন কোনো ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রেও আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

* ডায়াবেটিস থাকলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখুন। বাড়িতে গ্লুকোমিটার দিয়ে নিয়মিত পরীক্ষা করুন।

* উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ওষুধ সেবন করতে ভুল করবেন না। রক্তের চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মাঝেমধ্যে রক্তের চাপ কত আছে জেনে নিন।

* নিয়মিত হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়ামের অভ্যাস চালিয়ে যেতে হবে। বাড়িতে ট্রেডমিল মেশিন থাকলে সেটিও ব্যবহার করতে পারেন।

* কোষ্ঠকাঠিন্য এড়িয়ে চলুন।

* হার্টের কার্যক্ষমতা ভালো থাকলে পরিমিত পানি পান করবেন। হার্ট দুর্বল হলে বা LVEF কম হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে তরল গ্রহণ করুন।

* শাকসবজি কাঁচা ফলমূল ভালো করে ধুয়ে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখুন।

* চিনি এবং লবণ এড়িয়ে চলুন।

* শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করুন।

* ধূমপান করবেন না। এ ছাড়া তামাকজাতীয় দ্রব্য বর্জন করুন।

* করোনা প্রতিরোধক সব স্বাস্থ্যবিধি অবশ্যই মেনে চলতে হবে।

অনেক হৃদরোগী, যাঁরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন, তাঁদের অনেকের শরীর এবং মনের ওপর নেতিবাচক নানা প্রতিক্রিয়া হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তাঁদের বলছি, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে যাপিত জীবনে ছন্দপতন হবে না। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করুন। জীবনকে জয়ী করতে হলে করোনাকে হারাতে হবে।

এই বিভাগের আরো খবর
Loading...