বসবাস অযোগ্য নরকে পরিণত হচ্ছে বিশ্ব

ডেস্ক রিপোর্ট

0 7

গত ২০ বছরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনঘটা বৃদ্ধিতে কোটি কোটি মানুষের জন্য ‘বসবাস অযোগ্য নরকে’ পরিণত হয়ে উঠছে বিশ্ব। জলবায়ু সঙ্কটকেই এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘ বলছে, বিশ্ব নেতারা দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই সঙ্কট মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়বে।

সোমবার জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস সংক্রান্ত অফিস ইউএনডিআরআরের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই সতর্কবার্তা দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রশমনে ফলপ্রসূ ব্যবস্থা নিতে বিশ্ব রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের ব্যর্থতায় এই গ্রহ ধীরে ধীরে কোটি কোটি মানুষের জন্য বসবাস অযোগ্য নরকে পরিণত হচ্ছে।

ইউএনডিআরআর বলছে, ১০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া করোনাভাইরাসও দেশে দেশে মৃত্যুর ঢেউ থামাতে না পারা ক্ষমতাসীনদের সামগ্রিক ব্যর্থতার মুখোশ উন্মোচন করেছে। বিশেষজ্ঞরা বার বার সতর্ক করে দিলেও মহামারি মোকাবিলায় দেশগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারায় বিশ্বজুড়ে ৩ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ধুঁকছেন।

সংস্থাটি বলছে, শুধুমাত্র ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভূমিকম্প, সুনামি এবং হারিকেনসহ বিশ্ব বড় ধরনের ৭ হাজার ৩৪৮টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। এতে বিশ্বজুড়ে প্রাণ গেছে ১২ লাখের বেশি মানুষের এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪২০ কোটি মানুষ। শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের বাড়-বাড়ন্তে বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ২ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার।

‘দ্য হিউম্যান কস্ট অব ডিজ্যাস্টার্স ২০০৯-২০১৯’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির এই রেকর্ড ১৯৮০-১৯৯৯ সালের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। ওই সময় বিশ্ব ৪ হাজার ২১২টি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়।

এপিডেমিওলোজি অব ডিজ্যাস্টার্স এমারজেন্সি ইভেন্টস ডেটাবেইসের সেন্টার ফর রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক কোনও দুর্যোগে কমপক্ষে ১০ জন কিংবা তার বেশি মানুষের প্রাণহানি এবং একশো অথবা ততোধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা জারি অথবা আন্তর্জাতিক সহায়তা চাওয়া হলে সেটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ধরে নেয়া হয়।

গত ২০ বছরে ঘটে যাওয়া দুর্যোগের বেশিরভাগই জলবায়ুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। গবেষকরা বলছেন, আশির দশকের তুলনায় গত দুই দশকে বন্যা, ঝড়, খরা, তাপদাহ, হারিকেন এবং দাবানল অত্যধিক বেড়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রাও লাগামহীন হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এর ফলে চরম বৈরী আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বার বার ফিরে আসছে।

ইউএনডিআরআরের প্রধান মামি মিজুটরি ও বেলজিয়ামের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এপিডেমিওলোজি অব ডিজ্যাস্টার্সের প্রধান দেবরতি গুহ সাপির বলেন, এটাই সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় যে, আমরা স্বেচ্ছায় এবং জেনে শুনে নিজেদের ধ্বংসের বীজ বপন করে চলেছি।

তবে গত ২০ বছরে জলবায়ু দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়া। এই অঞ্চলে ২০০০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৮টি দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। এরপরই আছে আমেরিকা; এই অঞ্চল দেখেছে ১ হাজার ৭৫৬টি এবং আফ্রিকা ১ হাজার ১৯২টি দুর্যোগ।

বিশ্বে গত দুই দশকে দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চীন; দেশটি ৫০০ বার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ৪৬৭টি দুর্যোগ দেখেছে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয় ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের সুনামি, ২০০৮ সালের মিয়ানমারে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় নার্গিস এবং ২০১০ সালের হাইতির ভূমিকম্পকে। এসব দুর্যোগের প্রত্যেকটির আঘাতে গড়ে এক লাখের বেশি করে মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

তবে দুর্যোগের ব্যাপারে আগাম প্রস্তুতি এবং সতর্কবার্তা প্রদান ব্যবস্থার কারণে বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ কিছু জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। এর মধ্যে বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো কিছু দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর বন্যা ও সাইক্লোন মোকাবিলার উন্নত প্রস্তুতির কারণে অনেক মানুষের জীবন বাঁচানো গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

এই বিভাগের আরো খবর
Loading...