নিল নদের বহমান স্রোত

ডেস্ক রিপোর্ট

0 8

নিল নদ বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘতম। ছয় হাজার ৬৫০ কিমি দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট এ নদের তীর ঘিরে গড়ে ওঠে মিসরীয় সভ্যতা। মিসরের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ নদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই বলে নিল নদের আশীর্বাদ শুধু মিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, আফ্রিকা মহাদেশের ১১টি দেশের সীমারেখা দিয়ে বয়ে চলেছে নিল নদের পানি। দেশগুলো হলো—মিসর, সুদান, দক্ষিণ সুদান, উগান্ডা, ইথিওপিয়া, কঙ্গো, কেনিয়া, তানজানিয়া, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি ও ইরিত্রিয়া।

নানা দেশের মধ্য দিয়ে চলা নিল নদের দুটি উপনদ আছে। একটি শ্বেত নিল নদ। অপরটি নীলাভ নিল নদ। দুটি উপনদের মধ্যে শ্বেত নিল নদ দীর্ঘতম। শ্বেত নিল নদ আফ্রিকার মধ্যভাগের হ্রদ অঞ্চল থেকে উত্পন্ন। সর্ব দক্ষিণের রুয়ান্ডা থেকে উত্পন্ন হয়ে উত্তরে তানজানিয়া, উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। আর অন্যদিকে ইথিওপিয়া তানা হ্রদ থেকে উত্পন্ন হয়ে নীলাভ নিল নদ পূর্ব প্রান্তের সুদানের দিকে বয়ে গেছে। নিল নদের এই উপনদ দুটি সুদানের রাজধানী খার্তুমের কাছে এসে মিলিত হয়। বিশাল অববাহিকা অতিক্রম করে সব শেষে নিল নদ ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে।

নিল শব্দটি ‘নাহল’ থেকে উত্পন্ন। এর অর্থ প্রবহমান উপত্যকা। গ্রিক কবি হোমার তাঁর লেখা মহাকাব্য ‘ওডিসি’তে নিল নদকে ‘ইজিপ্টাস’ নামে অভিহিত করেছেন। মিসরের পর সুদানও নিল নদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। তাই সুদানিদের কাছে নিল নদ একাধিক নামে পরিচিত। নামগুলো হলো আল-নিল, আল-বাহার, নাহারা আল-নিল ইত্যাদি।

নিল নদের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোনো নদীর নেই। সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো, পৃথিবীর সব নদীর পানি যখন কমে যায় তখন নিল নদের পানি বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে সব নদীর পানি যখন বৃদ্ধি পায়, তখন নিল নদের পানি কমে যায়। এ ছাড়া আরো কিছু অবাক করা বৈশিষ্ট্য আছে। এটি প্রবাহিত হয় বড় বড় পাথর ও বালুময় প্রান্তরের ওপর দিয়ে। ফলে কোনো শেওলা ও ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে না। তা ছাড়া নিল নদের কোনো পাথর বা কঙ্কর সবুজ বর্ণ ধারণ করে না।

দক্ষিণ থেকে উত্তরে বয়ে চলা নদটি বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম সময়ে কিভাবে বন্যায় প্লাবিত হয়, তা প্রাচীন মিসরীয় ও গ্রিক চিন্তাবিদদের কাছে এক অজানা রহস্য। নিল নদের উত্তর অংশের প্রায় পুরোটা মিসরের মরুভূমির মধ্য দিয়ে প্রবহমান। মিসরীয় সভ্যতার প্রায় সবটুকু নিল নদের ওপর  নির্ভরশীল। তা ছাড়া নিল নদের তীরে তৈরি করা হয় প্রাচীন মিসরের বেশির ভাগ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। তাই মিসরকে ‘নিল নদের দান’ বলা হয়।

আগেকার সময় নিল নদকে ঘিরে নানা কুসংস্কারও চালু ছিল। নিল নদ ঘিরে একটি বিলুপ্ত কুসংস্কার হলো নারী বলি প্রথা। ওই সময় মিসরের এই নিল নদ প্রতিবছর শুকিয়ে যেত। ৬৪০ খ্রিস্টাব্দের আগ পর্যন্ত মিসরীয়রা নিল নদের পানিপ্রবাহের জন্য সুন্দরী নারী বলি দিত। মেয়ের মা-বাবাকে রাজি করিয়ে তাদের সুন্দরী ষোড়শী ও কুমারী মেয়েকে অলংকার ও সুন্দর পোশাক পরিয়ে নিল নদে নিক্ষেপ করা হতো। দিনটি তারা নাচ-গান, আনন্দ-উল্লাস ও ভোজন করে কাটাত।

৬৪০ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে মিসর এই কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১১৫/৭)

১৯২৯ সালের নিল নদ পানিবণ্টন চুক্তির পর থেকে বাঁধ নির্মাণ করা হলে নিল নদের প্রবাহে ব্যাঘাত তৈরি হয়। ১৯৫২ সালে সুদানের রোজায়ার্স বাঁধ, ২০০৯ সালের ম্যারো বাঁধ এবং ১৯৬৮ সালে মিসর আসওয়ান বাঁধ নির্মাণ করে। সর্বশেষ ইথিওপিয়ার বৃহত্ রেনেসাঁ বাঁধ নির্মাণ মিসরের সঙ্গে বিরোধ তৈরি করে। এদিকে অতিবৃষ্টির পাশাপাশি সুদানের ব্লু নিলের পানি গত এক শ বছরের সর্বোচ্চ পরিমাণ, সাড়ে ১৭ মিটার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভয়াবহ বন্যা তৈরি হয় সুদানে। আপাতদৃষ্টিতে এসব বাঁধ সুফল বয়ে আনলেও এতে হারিয়ে যাচ্ছে নদ-নদীর নাব্যতা।

এই বিভাগের আরো খবর
Loading...